Home / সর্বশেষ / বিতর্কিত ‘বিশ্বকাপ’ জয়ের কলংক থেকে মুক্তি চায় আর্জেন্টিনা!

বিতর্কিত ‘বিশ্বকাপ’ জয়ের কলংক থেকে মুক্তি চায় আর্জেন্টিনা!

বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনা সব সময়েই সমীহ জাগানিয়া নাম । দুইবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন দলটির নিজ দেশের বাইরেও রয়েছে কোটি কোটি ভক্ত । বিশেষ করে ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার ভক্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে ।

যা হালের মেসি যুগে এসে আকাশ ছুঁয়েছে । যদিও তিন যুগ হয়ে গেছে আর্জেন্টিনা আর ছুঁতে পারে নি স্বপ্নের বিশ্বকাপ । কিন্তু প্রতিটা আসরেই ফুটবলের সর্বোচ্চ শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর হয় ভক্তরা ।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসঃ আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস অনেক পুরনো । আঠারোশো শতকের মধ্যভাগ থেকে ব্রিটিশ বনিকদের হাত ধরে আর্জেন্টিনায় আধুনিক ফুটবলের আগমন ।

স্কটিশ অ্যালেক্সান্ডার ওয়াটসন হাটনের মাধ্যমে আর্জেন্টিনায় ফুটবল লীগ এ্যাসোসিয়েশনের গোড়াপত্তন , যা পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশনে রুপ নেয় ।

তিনি The Father of Argentine footbal হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত । হাটন ১৮৯৩ সালে আর্জেন্টিনায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যালামনাই এথলেটিক ক্লাব’ ।

এই দল থেকেই পরবর্তীতে অনেকে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে সুযোগ পান । ওয়াটসন হাটনের পুত্র আর্নল্ড হাটন নিজেও আর্জেন্টিনার হয়ে খেলছেন । এছাড়া এই দলের হুয়ান ব্রাউন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ছিলেন ।

অবশ্য আর্জেন্টিনার প্রথম ক্লাবের স্বীকৃতি পেয়েছে বুয়েন্স আইরেস ফুটবল ক্লাব । যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুই ব্রিটিশ নাগরিক থমাস আর জেমস হগের মাধ্যমে ।

১৮৯১ সালে প্রথম আর্জেন্টিনার ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন লীগ অনুষ্ঠিত হয় । ল্যাটিন আমেরিকায় যা প্রথম । এই লীগের কৃতিত্ব ওয়াটসনের । তিনিই আর্জেন্টিনায় প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের সূচনা করেন ।

আর্জেন্টিনার প্রথম জাতীয় ফুটবল দল গঠিত হয় ১৯০১ সালে। আর দেশটির জাতীয় দল প্রথম ম্যাচ খেলে ১৯০২ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে । সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল উরুগুয়েকে ।

উরুগুয়ের আলবিনো স্টেডিয়ামের এই ম্যাচটি ছিল ল্যাটিন আমেরিকার প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ । খেলার ৩ মিনিটেই গোল করেন চার্লস ডিকিন্সন । তিনিই ল্যাটিন আমেরিকার প্রথম আন্তর্জাতিক গোলদাতা হিসেবেও ইতিহাসে স্মরণীয় ।

আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক সাফল্যঃ ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপের দুইটি ট্রফি ছাড়াও আর্জেন্টিনার সাফল্যের ভাণ্ডার বিশাল । ল্যাটিনের সেরা আসর ‘কোপা আমেরিকা’য় ১৫ বার শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা ।

১৪ বার হয়েছে রানার্স আপ । ফিফা কনফেডারেশন্স কাপেও ১৯৯২ সালে শিরোপা জয়ের রেকর্ড আছে তাদের । ল্যাটিন আর ইউরোপের সেরাদের এক ম্যাচের ‘ফিনালিসিমা’ আছে দুইটি । এছাড়া ১৯৬০ সালে জিতেছিল প্যান-আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ ।

বয়সভিত্তিক অলিম্পিক ফুটবলেও ২০০৪ এবং ২০০৮ সালে টানা দুইটি সোনার পদক জিতেছে আর্জেন্টিনা । আছে প্যান আমেরিকান গেমসে সাতটি সোনার পদক ।

আর্জেন্টিনার পক্ষে সবচেয়ে বেশী ১৬৪ ম্যাচ খেলেছেন বর্তমান অধিনায়ক লিওনেল মেসি ।তাঁর গোলের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশী , ৯০টি । এছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪৭ ম্যাচ খেলেছেন হাভিয়ের মাশ্চেরানো ।

আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৬ গোল করেছেন গ্যাব্রিয়েল বাতিতুস্তা । তিনি অবশ্য মাত্র ৭৮টি ম্যাচ খেলেছেন দেশের হয়ে । ম্যাচ প্রতি তাঁর গোলের অনুপাত ০.৭২ । সেখানে মেসির ০.৫৫ ।

১৯৭৯ সালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়াগো ম্যারাডোনা ১৮ বছর ৭ মাস আর ৪ দিনের করেছিলেন প্রথম আন্তর্জাতিক গোল । তিনিই এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কমবয়সী আন্তর্জাতিক গোলদাতা ।

আর ৩৬ বছর ৭ মাসে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে আর্জেন্টিনা হয়ে গোল করেছিলেন মার্টিন পালেরমো । ২০১০ সালে গ্রীসের বিপক্ষে গোলটি করেছিলেন তিনি । এছাড়া ১৯৯৯ সালে কোপা আমেরিকায় কলম্বিয়ার বিপক্ষে এক ম্যাচে তিনটি পেনাল্টি মিস করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন পালেরমো !

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসঃ এখন পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে আর্জেন্টিনাকে ছাড়া । ১৯৩৮ , ১৯৫০ আর ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা নানাবিধ কারণে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয় ।

অন্যদিকে, ১৯৭০ সালে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি আলবেসেলেস্তেরা । তবে ১৯৭৪ সাল থেকে আলবেসেলেস্তেরা বিশ্বকাপে নিয়মিত অংশ নিচ্ছে ।

এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলে ১৭বার অংশগ্রহণে আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতেছে দুইবার , ১৯৭৮ আর ১৯৮৬ সালে । ফাইনালে হেরেছে ১৯৩০ , ১৯৯০ আর ২০১৪ বিশ্বকাপে । বিশ্বকাপের সর্বপ্রথম আয়োজনের ফাইনালে উঠে আর্জেন্টিনা হেরেছিল উরুগুয়ের কাছে । বাকী দুই ফাইনালে তাদের হারিয়েছে জার্মানি ।

১৯৩০ সালের অভিষেক বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে হারায় ফ্রান্সকে । সেই ম্যাচে ৮১ মিনিটে জয়সুচক গোলটি করেন লুইস ফিলিপ্পে মন্টি । তিনি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলদাতা । দ্বিতীয় ম্যাচেই আর্জেন্টিনা ৬-৩ গোলে হারায় মেক্সিকোকে । সেই ম্যাচে তিনটি গোল করেন গুইলের্মো স্টাবিলে । তিনিই আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাট্রিক-ম্যান ।

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলে মোট খেলেছে ৮১ ম্যাচ । জিতেছে ৪৭টি , ড্র ১০ আর পরাজয় ২৪ ম্যাচে । বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা মোট গোল করেছে ১৩৭টি আর হজম করেছে ৯৩টি ।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশী ১০ গোল গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার । তবে বাতিস্তুতার একটি রেকর্ড আছে যা এখনও ছুঁতে পারেন নি । তিনিই একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের দুইটি আসরে হ্যাট্রিক করেছেন । প্রথমটি ১৯৯৪ সালে গ্রীসের বিপক্ষে আর দ্বিতীয়টি ১৯৯৮ সালে জ্যামাইকার সাথে ।

বাতিস্তুতার পর বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আটটি গোল আছে দিয়াগো ম্যারাডোনা আর গুলের্মো স্টাবিলের । বর্তমান সময়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ গোলের সংখ্যা ছয়টি । ২০২২ আসরে পাঁচ গোল করলে তিনি হতে পারেন দেশের পক্ষে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশী গোলের মালিক ।

এছাড়া আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশী বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড গড়বেন মেসি কাতারে । ম্যারাডোনা আর হাভিয়ের মাশ্চেরানো ছাড়াও মেসি ইতোমধ্যে খেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ । কাতারে মাঠে নামলেই এককভাবে আর্জেন্টিনার পক্ষে সবচেয়ে বেশী পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডের মালিক হবেন তিনি ।

মেসির সামনে আছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপে সবচেয়ে ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়ার সুযোগ । বিশ্বকাপে ২১ ম্যাচ খেলেছেন ম্যারাডোনা । ২০টি মাশ্চেরানো । আর মেসির বিশ্বকাপ ম্যাচের সংখ্যা ১৯টি । অর্থাৎ কাতারে গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ খেললেই মেসি ছাড়িয়ে যাবেন অন্যদের ।

আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়েই কলংকের দাগঃ ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজন করে আর্জেন্টিনা । আর জিতে নেয় নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ । তবে আর্জেন্টিনার সেই বিশ্বকাপ জয় নিয়ে আছে তুমুল বিতর্ক ।

সেই সময়ে আর্জেন্টিনায় ছিল সামরিক শাসন । আর্জেন্টিনার কাঁধে বিশ্বকাপ আয়োজনের ভার তুলে দেওয়ায় ফিফাকেও কম সমালোচনা সহ্য করতে হয়নি । মানবাধিকার আর আইনের শাসনের অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনার সেই বিশ্বকাপকে পরিচিতি দিয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘কুখ্যাত’ আয়োজন হিসেবে।

১৬ দলের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপটি ছিল চার গ্রুপে বিভক্ত । প্রতি গ্রুপ থেকে দুইটি দল ওঠে পরবর্তী রাউন্ডে । যেখানে করা হয় আরও দুইটি গ্রুপ । আর দুই গ্রুপের সেরা দল শেষ পর্যন্ত খেলে ফাইনালে ।

অভিযোগ রয়েছে, সামরিক জান্তার প্রত্যক্ষ মদদে অনেক অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছিল আর্জেন্টিনা।যার শুরু গ্রুপ পর্ব থেকেই । স্বাগতিকরা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রতিটি ম্যাচের সূচি ঠিক করে রাতে । এর সুবিধা নিয়ে প্রথম পর্ব পার হয় স্বাগতিকরা। কারণ, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মাঠে নামার আগেই আর্জেন্টিনা জেনে গিয়েছিল গ্রুপের কোথায় দাঁড়িয়ে তারা।

এই বিতর্কের কারণে ফিফা পরের (১৯৮২) বিশ্বকাপ থেকেই এ নিয়ম পরিবর্তন করে দেয়। নিয়ম করা হয়, গ্রুপ পর্বে শেষ দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে একই সময়ে। যাতে, কে কোথায় দাঁড়িয়ে এ বিষয়টা আগে থেকে নির্ধারিত না থাকে এবং পাতানো খেলার কোনো ঘটনা না ঘটে।

তবে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে বেশী বিতর্কের জন্ম দেয় দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে । দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম তিন ম্যাচ শেষে ব্রাজিল ফাইনালের জন্য ছিল সবচেয়ে এগিয়ে ।

এখানে ব্রাজিল ৩-০ গোলে পেরুকে আর ৩-১ গোলে হারায় পোল্যান্ডকে । গোলশূন্য ড্র করে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে । অন্যদিকে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচে ২-০ গোলে পোল্যান্ডকে হারাবার পর ড্র করে ব্রাজিলের বিপক্ষে ।

তৃতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নিজ নিজ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল একই সময়ে । কিন্তু সেই ম্যাচ আরম্ভ হয়েছিল ব্রাজিল পোল্যান্ড খেলার পর । অর্থাৎ মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনা নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিল ফাইনালে উঠতে পেরুর বিপক্ষে কমপক্ষে চার গোলের ব্যবধানে জিততে হবে ! আর সেটাই হয়েছিল , চার গোল নয় বরং ৬-০ গোলের ব্যবধানে পেরুকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে স্বাগতিক আর্জেন্টিনা ।

অভিযোগ ওঠে , ম্যাচটি ছেড়ে দেয়ার জন্য পেরুকে বিপুল পরিমান অর্থ আর খাদ্যশস্য সহায়তা হিসেবে দেয় আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার । আসলে বিরোধী মত দমনে হত্যা , গুম আর গ্রেফতারে কলংকিত আর নিন্দিত সেই সময়ে আর্জেন্টিনার সামরিক শাসক জর্জ রাফায়েল ভিদেলা বিশ্বকাপের মাধ্যমে নিজের ইমেজ বিশ্বের কাছে উজ্জ্বল করায় ছিলেন মরিয়া ।

সেই কারণে ফাইনালে ওঠার জন্য সামরিক সরকার কোন দুর্নীতি অবলম্বনে দ্বিধা করে নি । সেই সময়ে পেরুর ব্যাংকিং পরিচালনা করতো আর্জেন্টিনা সেন্ট্রাল ব্যাংক এবং অভিযোগ রয়েছে, রাতারাতি পেরুর ফুটবলারদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। আবার পেরুর বামপন্থি নেতারা দাবি করেন, বিশ্বকাপে এই ম্যাচে হারের কারণে আর্জেন্টিনায় বন্দী থাকা ১৩জন বিদ্রোহীকে পেরুর হাতে তুলে দিয়েছিল আর্জেন্টাইন সরকার।

২০১২ সালে এই বিষয়ে মুখ খোলেন পেরুর সাবেক সংসদ সদস্য জিনারো লেদেসমা । তিনি বুয়েন্স আইরিসের আদালতে অভিযোগ করেন , ম্যাচের আগেই ফলাফল নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছে গিয়েছিল দুই দেশের সরকার । তখনকার বিরোধী দলে থাকা লেদেসমা জানান , আর্জেন্টিনার একনায়ক জর্জ ভিদেলা বিশ্বকাপে ওই খেলায় তার দেশের ফাইনালে ওঠার মতো পর্যাপ্ত গোলে পেরুর হারার শর্তে রাজবন্দী বিনিময় করেন !

সেই সময় দুই দেশেই চলছে সামরিক শাসন । সাধারণ মানুষ না চাইলেও নিজেদের স্বার্থে সামরিক শাসকদের মধ্যে ছিল দারুণ আঁতাত । আর সেটাকেই নানা উপঢৌকনের মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে পেরুকে পরিকল্পনামাফিক হারিয়ে ফাইনালে উঠে যায় আর্জেন্টিনা ।

ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল হল্যান্ড । সেই সময়ে বিশ্ব ফুটবলের সেরা তারকা ছিলেন হল্যান্ডের ইউহান ক্রুয়েফ । কিন্তু বিশ্বকাপের আগে বার্সেলোনায় তাকে অপহরণের চেষ্টা করা হয় । যদিও চেষ্টা সফল হয় নি । কিন্তু প্রাণভয়ে আর ৩১ বছরের ক্রুয়েফ আর্জেন্টিনায় যান নি বিশ্বকাপ খেলতে । কারণ ধারণা করা হয় , আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার এই অপহরণ চেষ্টার পেছনে দায়ী । আর সেটা তারা করেছিল ক্রুয়েফকে বিশ্বকাপ থেকে দূরে রাখতেই ! পরবর্তীতে ক্রুয়েফ নিজে প্রাণভয়ে আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার কথা সংবাদ-মাধ্যমে স্বীকার করেছেন ।

ফাইনালে আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে হারায় হল্যান্ডকে । গোটা ম্যাচে স্বাগতিক দর্শকদের বিরুপ আচরণের বিপক্ষে খেলতে হয় ডাচদের । বুয়েন্স আইরেস শহর থেকে দুরে রিভারপ্লেটের হোম ভেন্যু এস্টাডিও মনুমেন্টালে অনুষ্ঠিত ফাইনালে হারের পর পোস্ট ম্যাচেই যোগ দেয়নি রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস।

তবে সব বিতর্কের পরেও আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ছিলেন মারিও ক্যাম্পেস । ছয় গোল করে তিনি জেতেন আসরের সেরা গোলদাতা আর সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার । ফাইনালেও তিনি হাঁকান জোড়া গোল ।

তবে ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটি ছাড়া তেমন কোন বিতর্ক ছিল না । যদিও সেই গোলটি না হলে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটির ফলাফল কি হত , বলা মুশকিল । ইংল্যান্ড এখনও সেই ম্যাচটি নিয়ে তাদের ক্ষোভ ভুলতে পারে নি ।

আর্জেন্টিনার সেরা তারকাঃ বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনা অনেক বড় বড় তারকার জন্ম দিয়েছে । এমনকি সর্বকালের সেরাদের তালিকায়ও আর্জেন্টিনার একাধিক খেলোয়াড় জায়গা করে নেবেন । যাদের মধ্যে সবার শীর্ষে থাকবেন অবশ্যই দিয়াগো ম্যারাডোনা । জাতীয় দলের জার্সিতে ম্যারাডোনার মত নিবেদিত ফুটবলার আর্জেন্টাইনরা আর কখনও পাবে কিনা সন্দেহ । ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ এখন পর্যন্ত তারকা সম্মিলনের বিচারে সেরা । ব্রাজিলের জিকো-সক্রেটিস , জার্মানির কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগে-লোথার ম্যাথুজ , ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি , ইটালির পাওলো রসি , বেলজিয়ামের এঞ্জো শিফো , উরুগুয়ের জর্জ ফ্রান্সেসকোলি ,মেক্সিকোর হুগো সাঞ্চেজ , ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার-পল গ্যাস্কোয়েন- পিটারশিলটন-জন বার্নস , রাশিয়ার ওলে ব্লকিন , পোল্যান্ডের বনিয়েকেরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের সর্বকালের সেরা তালিকায় থাকবেন । অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দলে ম্যারাডোনা ছাড়া তারকা বলতে তেমন কেউ ছিল না । কিন্তু সেই ম্যারাডোনাই একক নৈপুণ্যে ভালডানো , বুরুচাগা আর পাসারেল্লাদের নিয়ে বাজীমাৎ করেন । যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা গোল নিয়ে এখনও বিতর্কের শেষ হয় নি , কিন্তু ইংল্যান্ডের সেই ম্যাচেই ম্যারাডোনা করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোল । মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত আসরে ম্যারাডোনা করেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাঁচ গোল আর জেতেন সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন-বল’ । বিশ্বকাপের সাত ম্যাচের প্রতিটাতে অধিনায়ক ম্যারাডোনার মাঠে বিচরণ ছিল রাজসিক ।

১৯৯০ সালেও ম্যারাডোনা দলকে নিয়ে যান ফাইনালে । সেই বিশ্বকাপে অনেক দলই নব্বই মিনিট কোনমতে কাটিয়ে টাইব্রেকারে যাওয়ার পথে হেঁটেছিল । সাথে ছিল ফাউল প্রবণতা । গ্রুপ পর্বেই রেকর্ড ১৬ লাল কার্ড আর এই পর্যন্ত বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম আনুপাতিক গোল দেখে ইটালিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপ । আর এই ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা ছিল অগ্রভাগে । ফাইনালে খেলা আর্জেন্টিনা পুরো আসরে করে মাত্র পাঁচটি গোল , যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা যে কোন দলের সর্বনিম্ন । শুধু তাই না , গোলরক্ষকের দিকে বারবার ব্যাকপাসের বিরক্তিকর প্রদর্শনী করে আর্জেন্টিনা । আসলে রক্ষণাত্মক কৌশলই ছিল ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হাতিয়ার । কিন্তু এমন প্রদর্শনীর পরেও শুধু মাত্র ম্যারাডোনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর বুদ্ধিদীপ্ত খেলা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যায় ফাইনালে । সাথে ছিল ভাগ্য ।

নক আউট পর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে সারাক্ষণ প্রচণ্ড চাপে থাকা আর্জেন্টিনা জয় পায় একমাত্র গোলে । সেটাও ম্যারাডোনার ডিফেন্সচেরা পাসে ক্যানিজিয়ার গোলে । অথচ সেই ম্যাচে ব্রাজিল ‘হালি’ গোল দিলেও অবাক হবার কিছু ছিল না । সেই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা অনেক ফাউলের শিকার হয়েছেন , আবার অভিনয় করেছেন তারচেয়ে বেশী । বারবার ফাউল আদায় করেছেন , খেলার সময় নষ্ট করেছেন । পরে গোলরক্ষক গয়কোচিয়ার অসাধারণ বীরত্বে কোয়ার্টার আর সেমিতে টাইব্রেকারের জয় নিয়ে তারা উঠে আসে ফাইনালে । আসলে এটাই ছিল ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার মুল পরিকল্পনা । ফাইনালেও একই ধারায় খেলেছে আর্জেন্টিনা । যদিও শেষ পর্যন্ত আন্দ্রে ব্রেহমার বিতর্কিত পেনাল্টি গোলে জার্মানি জিতে যায় তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ । আর আর্জেন্টিনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয় রানার আপ হয়ে ।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হন আসর থেকে । কিন্তু তার আগেই তিনি জায়গা করে নেন সর্বকালের সেরা ফুটবলারের শীর্ষ দুইয়ে । এমনকি ব্রাজিলের ‘কালো মানিক’ পেলে আর ম্যারাডোনার মধ্যে কে সর্বকালের সেরা – সেই বিতর্ক এখনও থামে নি ।

ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে হিসেবে বিবেচনায় ছিলেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো । আর্জেন্টিনায় জন্ম নেয়া এই ফুটবলার খেলেছেন স্পেনের পক্ষেও । যদিও তাকে কখনও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যায় নি । স্টেফানো সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতেন । স্পেনের ক্লাব রিয়েল মাদ্রিদে তার সাফল্য অবিস্মরণীয় । ১৯৪৩ আর্জেন্টিনার রিভারপ্লেট ক্লাবে তার খেলোয়াড়ী জীবন শুরু হয়। পরবর্তী এক দশক তিনি আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়ার বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন। ১৯৫৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদে আসার পর ফেরেঙ্ক পুসকাসের সাথে ফরোয়ার্ড লাইনে তার অনবদ্য জুটি গড়ে উঠে । ১৯৬৪ পর্যন্ত রিয়ালের হয়ে তিনি সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি করেন ৩০৮ গোল, যা ক্লাবটির ইতিহাসে তাকে লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতায় পরিণত করে। যদিও পরবর্তীতে রাউল গঞ্জালেজ আর করিম বেঞ্জেমা ভেঙ্গেছেন সেই রেকর্ড । আর ৪৫০ গোল করে রিয়েলের সর্বকালের সেরা গোলদাতার তালিকায় আসীন হয়েছেন ‘আধুনিক ফুটবলের সম্রাট’ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ।

‘সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে – এই প্রশ্নে বেশিরভাগ মানুষই পেলে আর ম্যারাডোনায় বিভক্ত হয়ে যান। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে ফিফার বিচারকগণ গত শতাব্দীর সেরা যে খেলোয়াড়ের তালিকা করেছিলেন , তাতে পেলের পরেই অবস্থান করেছিলেন ডি স্টেফানো। শুধুমাত্র ক্লাব ফুটবল বিবেচনা করলে সম্ভবত সর্বকালের সেরা ফুটবলার হয়ে যেতেন ডি স্টেফানো। রিয়েলের হয়ে আটটি লীগ আর পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লীগ) জিতেছেন তিনি । রিয়েলকে গ্রেটেস্ট ক্লাবে পরিনত করার কৃতিত্ব অনেকটাই এই স্টেফানোর ।

স্টেফানোর মতই বার্সেলোনার হয়ে (এখন পর্যন্ত) বিশ্ব শাসন করা সর্বকালের সেরা আর্জেন্টাইনের সেরা তিনে থাকবেন লিওনেল মেসি । তবে তিনি দেশের হয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলে উঠেছেন একবার ফাইনালে , জিতেছেন একটি কোপা আমেরিকা । দেশের হয়েও সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড তার । তাই ম্যারাডোনার পরেই মেসিকে রাখা হবে সেরা তালিকায় ।

এছাড়া মারিও ক্যাম্পেস , পাসারেল্লা , বাতিস্তুতা , হাভিয়ের জানেত্তি , হাভিয়ের মাশ্চেরানোরা আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় তালিকায় জায়গা পাওয়ার দাবী রাখেন ।

রোড টু কাতারঃ ল্যাটিন আমেরিকা থেকে চারটি দল সরাসরি পেয়েছে কাতার বিশ্বকাপের টিকেট । ১০ দেশের বাছাই পর্বের লড়াই শেষে ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় স্থানে থেকে কাতারে পা রাখছে আর্জেন্টিনা । বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ১৭ ম্যাচে আর্জেন্টিনা পেয়েছে ৩৯ পয়েন্ট । আর ব্রাজিল ৪৫ পয়েন্ট নিয়ে ল্যাটিনে পেয়েছে শীর্ষস্থান । দুই দলের মধ্যে একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে । ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত বাতিক হয়েছে ।

আর্জেন্টিনা ১৭ ম্যাচে জয় পেয়েছে ১১টি আর ড্র ৬টি । অর্থাৎ কোন ম্যাচ হারে নি এখন পর্যন্ত । এই ম্যাচগুলোয় আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের জালে বল ফেলেছে ২৭ বার । আর তাদের নিজেদের জালে বল ছুঁয়েছে আটবার ।

ল্যাটিন অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ সাতটি করে গোল হাঁকিয়েছেন লিওনেল মেসি আর লাউতেরো মার্টিনেজ । আনহেল ডি মারিয়া আর নিকোলাস গঞ্জালেজ পেয়েছেন তিনটি করে গোলের দেখা ।

নক আউট পর্বেই থাকছে শংকাঃ কাতার বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপে খেলবে আর্জেন্টিনা । যেখানে তাদের সঙ্গী মেক্সিকো , পোল্যান্ড আর সৌদি আরব । অপেক্ষাকৃত সহজ গ্রুপ । পোল্যান্ড রবার্ট লেভেন্ডস্কির উপর এককভাবে নির্ভরশীল দল । মেক্সিকো সব সময় বিশ্বকাপে সমীহ জাগানিয়া দল হলেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের তিন দেখায় প্রতিবার হেরেছে । অন্যদিকে সৌদি আরব আর্জেন্টিনা বধ করবে – এমন আশা করার মানুষ খুব কম । তাই নিজেদের গ্রুপ থেকে আর্জেন্টিনা সেরা হয়েই নক আউট পর্বে যাবে – এটা ধরে নিয়ে এগুতে হচ্ছে । তবে নিজেদের গ্রুপে আর্জেন্টিনা কোন অঘটনের শিকার হলে অথবা ‘ডি’ গ্রুপে ফ্রান্স রানার আপ হলে দুই দলের মুখোমুখি দেখা হয়ে যাবে নক-আউট পর্বে । সেই ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা কিংবা ফ্রান্সের যে কেউ বাদ পড়তে পারে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই । তবে আর্জেন্টিনা আর ফ্রান্স নিজ নিজ গ্রুপে সমানভাবে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হলে সেই সমস্যা থাকছে না । সেই ক্ষেত্রে ‘ডি’ গ্রুপ থেকে ডেনমার্ক, তিউনিশিয়া কিংবা পেরু/আমিরাত যে উঠবে নক আউটে তাদের সাথে খেলা হবে মেসিদের ।

ডেনমার্কের বিপক্ষে খেলা ম্যাচ পড়লেও কঠিন বাঁধার মুখে পড়তে হবে মেসিবাহিনীকে । কারণ এই মুহূর্তে ডেনমার্ক বেশ গোছানো দল । তাদের কাছে নেশন্স কাপে পুরো স্কোয়াড নিয়ে হার মেনেছে বর্তমান বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স । আর্জেন্টিনার সাথেও তিনবারের মোকাবেলায় একটি জয় আছে । ১৯৯৫ সালে ফিফা কনফেডারেশন্স কাপে আর্জেন্টিনাকে ২-০ হারিয়েছিল ডেনমার্ক । ১৯৯৩ সালে ‘লা ফিনালিসিমা’য় দুই দলের ম্যাচ ১-১ গোলে সমতায় ছিল । শেষ পর্যন্ত দিয়াগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতে নেয় টাইব্রেকারে । আর ১৯৬৬ সালে আর্জেন্টিনা ০-২ গোলে হারিয়েছিল ডেনিশদের । বিশ্বকাপে কখনও দেখা হয় নি দুইদলের । ফিফা র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা ডেনমার্কের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচ সহজ হবে না , বলা যায় । তবে বিশ্বকাপ জিততে হলে কোন ম্যাচই সহজ না কারো জন্য । আর তাই ডেনমার্ক কিংবা ফ্রান্স , নক আউট পর্বে প্রতিপক্ষ যেই হোক , আর্জেন্টিনাকে জিততেই হবে ।

মিটেছে আর্জেন্টিনার শিরোপা ক্ষরাঃ দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে একটি আন্তর্জাতিক শিরোপার অপেক্ষায় ছিল আর্জেন্টিনা । ১৯৯৩ সালে কোপা আমেরিকার পর তারা পায় নি কোন শিরোপা । মাঝে চারবার কোপা আমেরিকা , একটি বিশ্বকাপ এবং দুইটি কনফেডারেশন্স কাপের ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত কেঁদে মাঠ ছাড়তে হয় আর্জেন্টিনাকে । তবে ২০২১ সালের জুলাইয়ে সেই প্রতিক্ষার অবসান হয়েছে । ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত আসরের ফাইনালে স্বাগতিকদের ১-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা জিতেছে কোপা আমেরিকা । হয়েছে ২৮ বছরের শিরোপা ক্ষরার অবসান । যা লিওনেল মেসিসহ এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্যেও প্রথম শিরোপা । বিশ্বকাপের আগে এমন একটি শিরোপা নিশ্চিতভাবেই কাতারে আর্জেন্টিনা দলকে বাড়তি উদ্দীপনা জোগাবে । আসরে মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে চার গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্ট করেছেন পাঁচটি। নির্বাচিত হয়েছে ব্রাজিলের নেইমারের সাথে যৌথভাবে সেরা খেলোয়াড় । তবে আসরের সেরা গোলদাতা ছিলেন মেসিই ।

এছাড়া চলতি বছর আর্জেন্টিনা জিতেছে ‘লা ফিনালিসিমা’ । ইউরোপ আর ল্যাটিনের দুই সেরা ইটালি আর আর্জেন্টিনাকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই ম্যাচ । যেখানে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে হারায় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইটালিকে ।

আর্জেন্টিনার আছে একজন স্কোলানিঃ ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর দায়িত্ব হারান জর্জ সাম্পাওলি । আর্জেন্টিনার নতুন কোচ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় লিওনেল স্কোলানির নাম । যদিও সংশয় ছিল , ক্রমাগত ব্যর্থতায় থাকা একটি দলকে তিনি কতটুকু উদ্ধার করতে পারবেন ! তবে দায়িত্ব নেয়ার চার বছর পর দেখা যাচ্ছে , আর্জেন্টিনাকে তিনি পরিনত করেছেন বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় এক দলে । রাশিয়া বিশ্বকাপের পর অপেক্ষাকৃত নতুনদের নিয়ে একের পর এক পরীক্ষায় অনেকটাই সফল এই কোচ । তার অধীনে আর্জেন্টিনা জিতেছে কোপা আমেরিকা আর লা ফিনালিসিমা । বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা শিরোপার অন্যতম দাবীদার ।

জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এখন পর্যন্ত ৪৯ ম্যাচে ৩৩ জয়ের দেখা পেয়েছেন স্কোলানি। ড্র.১২ টি আর হার ৪টি । সবচেয়ে বড় কথা , তার অধীনে আর্জেন্টিনা সর্বশেষ ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়েছে ।

লিওনেল স্কোলানি সবচেয়ে বড়গুণ তিনি খেলার ধারা অনুযায়ী দলের ফর্মেশন পরিবর্তন করতে পারেন । কখনও ৪-৩-৩ আবার কখনও ৪-৩-২-১ বা ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে দলকে উদ্বুদ্ধ করেন । বিশ্বকাপে তাঁর পছন্দের একাদশ হতে পারে –

এমিলিয়ানো মার্টিনেজ (গোলরক্ষক) , নাহুয়েল মোলিনা , ক্রিস্টিয়ান রোমেরো , নিকোলাস ওটামেন্ডি , নিকোলাস তাগলিয়াফিকো , গুইদো রদ্রিগেজ/লিয়েন্দ্রো পেরেদেস , রদ্রিগো ডি পল , লিওনেলে মেসি , আনহেল ডি মারিয়া , জিওভান্নি লে সোলসো , লাউতারো মার্টিনেজ

আর্জেন্টিনার বড় তারকা মেসিইঃ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় তারকা অবশ্যই লিওনেল মেসি । যদিও আজীবনের ক্লাব বার্সেলোনা ছেড়ে ফ্রান্সের পিএসজিতে যোগ দেয়ার পর ২০২১-২২ মৌসুম একেবারেই ভাল যায় নি তার । সব মিলিয়ে ৩৪ ম্যাচে তার গোলের সংখ্যা মাত্র ১১টি , যার মধ্যে লীগ ওয়ানে করেছেন ছয়টি গোল । এসিস্ট ১৪টি । ২০০৫-০৬ মৌসুমের পর এত কম গোল আর কখনও করেন নি মেসি । তবে বিশ্বকাপের আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে দারুণ ছন্দে ‘খুদে যাদুকর’ । পিএসজির হয়ে সব মিলিয়ে ১১ মিলিয়ে ১৬ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ১১টি ।

এছাড়া দেশের হয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তার ফর্ম অন্য সময়ের সাথে পার্থক্য করার মত । বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দলের হয়ে যৌথ সর্বোচ্চ সাতটি গোল আর সর্বশেষ কোপা জয়ে পাঁচ গোল করে রেখেছেন বড় ভূমিকা । হয়েছেন আসরের সেরা খেলোয়াড় আর সেরা গোলদাতা । ২০২২ সালে মাত্র ৬ ম্যাচেই পেয়েছেন ১০ গোল । দেশের হয়ে ১৬৪ ম্যাচে তার গোলের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৯০টি । আর সর্বকালের আন্তর্জাতিক গোলদাতা তালিকায় আছেন পাঁচ নাম্বারে । ব্যালন ডি অর আর ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শ্যু জয়ে রেকর্ড গড়া মেসি ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে জিতেছেন গোল্ডেন বল । ১৪বার আর্জেন্টিনার বর্ষসেরা হওয়া মেসি কাতার যাচ্ছেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে । ক্লাবের হয়ে ৩৫টি শিরোপা জিতলেও দেশের হয়ে জিতেছেন কেবল কোপা আমেরিকা আর এক ম্যাচের লা ফিনালিসিমা । ক্লাব ফুটবলে সাতশোর বেশী গোল করা মেসির দিকে তাকিয়ে থাকবে ভক্তরা সন্দেহ নেই । দেশের হয়ে বড় ম্যাচে নিজেকে সেভাবে প্রমাণ করতে না পারা মেসি সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন কাতারে । নিজের নামের পাশে থাকা সেই অপবাদ তিনি কতটুকু ঘোচাতে পারেন সেটা জানা যাবে নভেম্বর-ডিসেম্বরেই ।

ভরসা সেই ডি মারিয়াঃ আনহেল ডি মারিয়াকে বলা যায় আর্জেন্টিনা দলের ‘আনসাং হিরো’ । যিনি বিশেষ করে বড় ম্যাচে আর্জেন্টিনার সেরা তারকা হয়েই নিজেকে প্রমাণ করে গেছেন বারবার । ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ডি মারিয়ার দেয়া একমাত্র গোলে সুইজারল্যান্ডকে নক আউট করে আর্জেন্টিনা । পরের ম্যাচেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি এসিস্ট করেন গঞ্জালো হিগুইনের গোলে । তবে সেমি ফাইনাল আর ফাইনালে খেলতে পারেন নি ডি মারিয়া । অনেকেই মনে করেন , ফাইনালে এই তারকা ফুটবলার থাকলে মেসিদের হাতেই উঠত বিশ্বকাপ শিরোপা । ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের নক আউট পর্বেও ফ্রান্সের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক গোলে সমতা এনে দিয়েছিলেন ডি মারিয়া । আবার ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার একমাত্র গোলেই কাটে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপা দুঃস্বপ্ন । সবশেষ লা ফিনালিসিমা ম্যাচেও দুর্দান্ত এক গোল আচ্ছে তাঁর ।

হিসেবে দেখা গেছে , নক আউট পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ডি মারিয়া সব সময়েই আর্জেন্টিনার সেরা অস্ত্র । এখন পর্যন্ত দেশের হয়ে ৩৪ বছর বয়সী উইঙ্গার খেলেছেন ১২৩ ম্যাচ ম্যাচ , করেছেন ২৫ গোল । কাতারে তিনি খেলতে চলেছেন নিজের ক্যারিয়ারের চতুর্থ আর শেষ বিশ্বকাপ । বেনফিকা , রিয়েল মাদ্রিদ , ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আর পিএসজির মত বড় দলের অভিজ্ঞতায় ডি মারিয়া আর্জেন্টিনা দলের অন্যতম বড় তারকা । উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে মেসি আর রোনালদোর পর সবচেয়ে বেশী (৩২) এসিস্ট তার নামের পাশে । কাতারে সাফল্য পেতে ডি মারিয়ার কাছ থেকে সেরাটাই চাইবে আর্জেন্টিনা ।

সমাধান হয়েছে গোলরক্ষক সমস্যারঃ আর্জেন্টিনার বর্তমান স্কোয়াডে প্রায় প্রতিটা পজিশনে আছে প্রতিভাবান ফুটবলার । অনেকদিন আর্জেন্টিনা দল গোলরক্ষক সমস্যায় ভুগেছে । কিন্তু বর্তমানে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ খেলছেন আস্থার সাথে । ২৯ বছর বয়সী এস্টন ভিলার কিপার ছিলেন ২০২১ সালে আর্জেন্টিনা দলের কোপা আমেরিকা জয়ের নায়ক । আসরের সেমিতে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তিনটি শট ঠেকিয়ে রাতারাতি তারকা বনে যান তিনি । এছাড়া গ্রুপ পর্বে ঠেকান চিলির বিপক্ষে আর্ত্যরো ভিদালের পেনাল্টি , যদিও সেখানে ফিরতি শটে গোল করেন ভার্গাস । ফাইনালে ব্রাজিল তাকে পরাস্ত করতে পারে নি । তিনি জেতেন আসরের সেরা গোলরক্ষকের ‘গোল্ডেন-গ্লোভস’ । তারকা বনে যাওয়া মার্টিনেজ সর্বশেষ প্রিমিয়ার লীগে ১১ম্যাচে ক্লিন শিট রাখতে পেরেছেন । তবে গোল হজম করেছেন ৩৭ ম্যাচে ৪৯টি !

বিশ্বকাপে মার্টিনেজকেই এক নাম্বার গোলরক্ষক হিসেবে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী । ব্যাক আপ হিসেবে অভিজ্ঞ ফ্রাংকো আরমানি আর গুয়ারনিমো রুল্লি হবেন কোচের পছন্দ ।

রক্ষণে আছে নির্ভরতাঃ রক্ষণে ওটামান্ডির আছে দুইটি বিশ্বকাপ আর চারটি কোপা খেলার অভিজ্ঞতা । ৩৪ বছরের এই সেন্টার ব্যাক খেলেছেন দেশের হয়ে ৯২ ম্যাচ , করেছেন চার গোল । ক্লাব ফুটবলে পোর্টো , ভ্যালেন্সিয়া , এথলেটিকো মাদ্রিদ (লোন) আর ম্যান সিটি হয়ে সর্বশেষ মৌসুমে খেলেছেন বেনফিকায় ।

রক্ষণে ইদানিং আর্জেন্টিনার হয়ে আলো ছড়াচ্ছেন নাহুয়েল মলিনা । ২০২১ সালে দেশের হয়ে কোপা আমেরিকা জিতেছেন । খেলেছেন ১৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ । কাতার বিশ্বকাপেও তার অন্তর্ভুক্তি অনেকটাই পাকা । ইটালির ক্লাব উদিনিসেতে বর্তমানে আছেন তিনি ।

দিন দিন আর্জেন্টিনা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো । ২৯ বছরের এই লেফট ব্যাক দেশের হয়ে খেলছেন ২০১৭ সাল থেকে । জিতেছেন ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা । আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা ৪২টি । ২০১৭-১৮ মৌসুম থেকে ইউরোপে আসা এই ফুটবলার রয়েছেন ডাচ ক্লাব আয়াক্সে ।

গারম্যান পাজেল্লা ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ প্রাথমিক স্কোয়াডে ছিলেন । যদিও শেষ পর্যন্ত ২৩ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াডে তাকে রাখেন নি কোচ সাম্পাওলি । তবে স্কোলানির স্কোয়াডে অনেকটাই নিয়মিত তিনি । এমনকি ২০১৯ সালের মার্চে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রেন্ডলি ম্যাচে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন । দেশের হয়ে খেলেছেন ৩১ ম্যাচ , গোল দুইটি । ৩০ বছরের সেন্টার ব্যাক রিয়েল বেটিসে চিলিয়ান অভিজ্ঞ কোচ ম্যানুয়েল পেলিগ্রিনির অন্যতম অস্ত্র । দলকে জিতিয়েছেন স্প্যানিশ কোপা ডেল রে । জিতেছেন কোপা আমেরিকাও । নেমেছিলেন ফাইনালে বদলী হিসেবেও । আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে ৩১ ম্যাচে দুই গোল আছে তার ।

ক্রিস্টিয়ান রোমেরো সেন্টার ব্যাক পজিশনের খেলোয়াড় । ছিলেন ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম একাদশে । দেশের হয়ে ১২ ম্যাচে একটি গোল করেছেন । ২০২১ সালেই আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের পর দলে নিয়মিত । ২৪ বছরের এই তারকা সর্বশেষ মৌসুমে ধারের খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছেন ইংল্যান্ডের বড় ক্লাব টটেনহ্যামে । পুরো মৌসুমে ক্লাবের হয়ে ৩০ ম্যাচে মাঠে নেমে দিয়েছেন আস্থার প্রতিদান ।

লেফট ব্যাক পজিশনে স্কোলানির মুল আস্থায় আছেন মার্কোস আকুইনা । দেশের হয়ে ইতোমধ্যে ৪২ ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে । ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে প্রামথিক স্কোয়াডে থাকলেও ছিলেন না চূড়ান্ত দলে । তবে কোন অঘটন না ঘটলে কাতার বিশ্বকাপে তাকে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাবে । ২০২০-২১ মৌসুম থেকে খেলছেন স্পেনের অন্যতম ক্লাব সেভিয়ায় । সর্বশেষ মৌসুমে মাঠে নেমেছেন ৪০টি ম্যাচে ।

রাইট ব্যাক পজিশনে গঞ্জালো মন্টিয়েল ২০১৯ সালে অভিষেকের পর জাতীয় দলের জার্সিতে খেলছেন ১৭ ম্যাচ । ব্রাজিলের বিপক্ষে কোপা আমেরিকার ফাইনালে মাঠে ছিলেন পুরো সময় । সেভিয়ার হয়ে সর্বশেষ মৌসুমে নেমেছেন ২৮ ম্যাচে । চলতি মৌসুমেও স্প্যানিশ ক্লাবের নিয়মিত সদস্য ।

মধ্যমাঠে আছে আস্থা আর বৈচিত্র্যঃ আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠে চিরকালীন ভাবেই বিশ্ব ফুটবলে সেরাদের সেরারা খেলেছেন । দিয়াগো ম্যারাডোনার হিসেব তো আলাদাই এছাড়া আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠে খেলছেন হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন , দিয়াগো সিমিওনে , হাভিয়ের মাশ্চেরানো , ড্যানিয়েল বার্তোনি , রেনে হাউসম্যান , রোডোন্ডো , হাভিয়ের জানেত্তি , রিকুয়েলমে , সার্জিও বাতিস্তার মত তারকা । যারা নিজ নিজ সময়ের সেরা তারকাদের কাতারে ছিলেন সব সময়েই । বর্তমানে আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠে জিওভানি লো সোলসো , রদ্রিগো ডি পল , এক্সাকুয়েল পালাসিওস , গুইডো রদ্রিগেজ আর আলেক্সিস ম্যাক অলিস্টারের মত খেলোয়াড় আছেন । যারা অনেকেই বয়সে তরুণ আর প্রতিভাবান । লে সেলসোর কথাই ধরাই ধরা যাক । সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লীগে ভিয়ারিয়েলের হয়ে দেখিয়েছেন নজরকাড়া পারফর্মেন্স । দলকে তুলে এনেছিলেন ইউরোপের সেরা ক্লাব আসরের সেমিতে ।আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন ৪১ ম্যাচ , করেছেন দুইটি গোল । ছিলেন গত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডে । খেলেছেন দুইটি কোপা । জিতেছেন একটি ।

ডি পল বর্তমান সময়ের অন্যতম আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার । তার মধ্যে রয়েছে ‘বক্স টু বক্স’ মিডফিল্ড জেনারেলের গুণ । দিতে পারেন প্রতিপক্ষের সর্বনাশ ঘটিয়ে দেয়া লম্বা ফাইনাল পাস । সর্বশেষ মৌসুমে এথলেটিকো মাদ্রিদের মধ্যমাঠের নেতৃত্ব দিয়েছেন । খেলছেন ৪৮ ম্যাচ আর করেছেন চার গোল । মধ্যমাঠের খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাব ক্যারিয়ারে ৪৭টি গোলের মালিক তিনি । ২৮ বছর বয়সী এই তারকা দেশের হয়েও ৪৩ ম্যাচে গোল করেছেন দুইটি । ২০২১ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা জেতা এই ফুটবলার ছিলেন আসরের সেরা একাদশে । কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের মধ্যমাঠ সামাল দেবার মুল দায়িত্ব থাকবে ডি পলের কাঁধেই ।

লিয়েন্দ্রো পারাদেস খেলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভুমিকায় । আর্জেন্টিনার হয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুরুতেই নস্যাৎ করে নিজেদের আক্রমণের শুরুটা দারুণভাবে করার ক্ষমতা রাখেন । ২৭ বছরের পারাদেস দিন দিন আরও ক্ষুরধার হচ্ছেন । তিনি দেশের হয়ে ইতোমধ্যে খেলেছেন ৪৫ ম্যাচ , করেছেন চারটি গোল । সর্বশেষ মৌসুমে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের হয়ে মাঠে নেমেছেন ২২ ম্যাচে ।চলতি মৌসুমে ধারে জুভেন্টাসের হয়ে খেলছেন নিয়মত ।

গুইডো রদ্রিগেজ ২০২১ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা জয়ে ভুমিকা রেখেছেন । উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই আসরেই করেছেন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল । আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার ম্যাচের সংখ্যা ২৫টি । ২০২১-২২ মৌসুমে রিয়েল বেটিসের হয়ে দুর্দান্ত খেলেছেন রদ্রিগেজ । নেমেছেন ৪৭ ম্যাচে , গোল করেছেন দুইটি আর এসিস্ট তিনটি । বেটিসের হয়ে জিতেছেন কোপা ডেল রে ।

ম্যানুয়েল লাঞ্জানি এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে ভুমিকা রাখতে পারেন কাতারে । ইংলিশ ক্লাব ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডে ২০১৫-১৬ মৌসুম থেকেই আছেন । শুরুতে ক্লাবে ধারের খেলোয়াড় হিসেবে থাকলেও এখন স্থায়ী । সর্বশেষ মৌসুমে সব মিলিয়ে হ্যামারদের হয়ে মাঠে নেমেছেন ৪৫ ম্যাচে , করেছেন সাতটি গোল । আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অবশ্য নিয়মিত না । খেলেছেন মাত্র পাঁচটি ম্যাচ । কিন্তু কাতারে তিনি হতে পারেন স্কোলানির ভরসা ।

আক্রমণ ভাগ দারুন শক্তিশালীঃ আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ নিয়ে খুব বেশী চিন্তার লিছু নেই স্কোলানির । বরং যে দলে মেসি আর ডি মারিয়া খেলেন , তাদেরকে সব সময় আলাদা হিসেবে রাখবেই যে কোন প্রতিপক্ষ । এছাড়া আছে পাওলো দিবালা। অসম্ভব প্রতিভাবান এই ফুটবলারকে এক সময় মনে করা হত মেসির ভবিষ্যৎ বিকল্প । এখনো সেই চিন্তা থেকে সরে আসার কোন কারণ ঘটে নি । অল্প জায়গার মধ্যে বল বের করে আনা , ড্রিবলিং , বক্সের বাইরে থেকে আচমকা শটে গোল করার মত ক্ষমতা আছে তার । বক্সের মধ্যেও দারুণ বিপজ্জনক । ইতোমধ্যে ক্লাব ক্যারিয়ারের ২৯৩ ম্যাচে ১১৫ গোল পাওয়া হয়ে গেছে দিবালার । জুভেন্টাসের হয়ে ইটালিয়ান লীগে ২০১৯-২০ মৌসুমে জিতেছেন মোস্ট ভ্যালুয়েবল এ্যাওয়ার্ড । ২০১৬-১৭ মৌসুমে দলকে নিয়ে গেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে । নক আউট পর্বে মেসির বার্সেলোনাকে বিদায় নিতে হয় দিবালার অতিমানবিক পারফর্মেন্সের কাছে নতি স্বীকার করে । সর্বশেষ মৌসুমেও ক্লাবের হয়ে ৩৯ ম্যাচে ১৫ গোল করেছেন । দিবালা মুলত লেফট উইঙ্গার হলেও খেলতে পারেন প্রধান স্ট্রাইকার হিসেবে । কিংবা এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও । তবে মেসির খেলার ধরণ আর পজিশনের সাথে মিলে যাওয়ায় সেভাবে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ হয় নি । কারণ মেসি তার পজিশনে কিছু সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও বিশ্বসেরা । ২০১৫ সালে প্রথম সুযোগ পাওয়ার পর জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন মাত্র ৩৪ ম্যাচ । আছে তিনটি গোল । তবে বয়স মাত্র ২৮ বলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের সেরাটা দেয়ার অনেক সময় এখনও আছে তার ।

লাউটেরো মার্টিনেজ এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনা দলের প্রধান স্ট্রাইকার । আগুয়েরো আর হিগুইনদের পর তিনি এখন জাতীয় দলে নিয়মিত । স্ট্রাইকার পজিশনে স্কোলানির প্রথম প্রছন্দ মার্টিনেজ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ৪০টি আর গোল ২১টি । সর্বশেষ কোপা আমেরিকায় মেসির পরেই দলের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তিন গোল করেছেন । ল্যাটিন আমেরিকার বাছাইয়ে আর্জেন্টিনার পক্ষে তার গোলের সংখ্যা সাতটি । মেসির সাথে সর্বোচ্চ । মেসির চেয়ে খেলেছেন এক ম্যাচ কম । মেসির দুইটি পেনাল্টি গোল থাকলেও মার্টিনেজের কোন পেনাল্টি গোল ছিল না । ইন্টার মিলানের হয়ে সর্বশেষ মৌসুমে সব মিলিয়ে ৪৯ ম্যাচে ২৫ গোল করেছেন , এসিস্ট চারটি । এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার এক নাম্বার ফরওয়ার্ড হিসেবে বিশ্বকাপে নামার জন্য প্রস্তুত মার্টিনেজ । বয়স মাত্র ২৩ বলে তার সামনে রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার অন্যতম সেরা ফরওয়ার্ড হিসেবে বিশ্ব শাসনের সম্ভাবনা ।

২৭ বছরের আনহেল কোরেয়া দেশের পক্ষে খেলেছেন ২২ ম্যাচ । করেছেন তিনটি গোল । ২০১৪-১৫ মৌসুম থেকে আছেন এথলেতিকো মাদ্রিদে । সর্বশেষ লা লিগায় ১২ গোল করে দেখিয়েছেন নিজের দক্ষতা । এসিস্ট আছে পাঁচটি । উচ্চতায় আগুয়েরোর মত হলেও খেলার স্টাইলের কারণে অনেকে কোরেয়ার সাথে কার্লোস তেভেজের মিল খুঁজে পান । ফার্স্ট টাচ ফুটবলে দক্ষ এই ফরোয়ার্ডের রয়েছে দারুণ পজিশন সেন্স । তিনি স্কোলানির ভাণ্ডারের অন্যতম অস্ত্র । যাকে বিপদের সময় ব্যবহার করতে পারেন আলবেসেলেস্তে কোচ ।

সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সঃ বর্তমান সময়ে দুর্দান্ত ফর্মে আছে আর্জেন্টিনা । ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরেছিল তারা । তারপর থেকে টানা ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত । জিতেছে কোপা আমেরিকা আর লা ফিনালিসিমা । আর তিনটি ম্যাচ জিতলেই আর্জেন্টিনা ভেঙে দেবে ইটালির টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড । এই ৩৫ ম্যাচের মধ্যে আর্জেন্টিনার জয় এসেছে ২৬ ম্যাচে আর ড্র ৯টি । ৩৫ ম্যাচে টানা অপরাজিত থাকার রেকর্ড আছে ব্রাজিল আর স্পেনের ।

আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য বিশ্বকাপ স্কোয়াডঃ আর্জেন্টিনা দলে বর্তমানে খেলোয়াড়ের কোন অভাব নেই । প্রায় প্রতিটা পজিশনে বিশ্বমানের খেলোয়াড় থাকায় বিশ্বকাপের ২৬ জন বাছাই করা একটু কঠিন কাজ কোচ স্কোলানির জন্য । তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক আর প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার স্কোয়াড দেখে কিছু ধারণা পাওয়া যায় বিশ্বকাপের দল নিয়ে । সেই হিসেবে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে সুযোগ পেতে পারেন –

গোলরক্ষক- এমিলিয়ানো মার্টিনেজ , ফ্রাংকো আরমানি , জেরোনিমো রুল্লি রক্ষণভাগ- মার্কোস আকুইনা , নাহুয়েল মোলিনা , গঞ্জালো মন্টিয়েল , নিকোলাস ওটামেন্ডি , নেহুয়েন পেরেজ , জারম্যান পাজ্জেল্লা , ক্রিস্টিয়ান রোমেরো , নিকোলাস তাগলিয়াফিকো

মধ্যমাঠ- রদ্রিগো ডি পল , এঞ্জো ফার্নান্দেজ , আলেসান্দ্রো পাপু গোমেজ , জিওভান্নি লো সোলসো , অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার , এক্সাকুয়েল পালাসিওস , লেয়েন্দ্রো পারাদেস , গুইদো রদ্রিগেজ

ফরোয়ার্ড- হুলিয়ান আলভারেজ , জোয়াকুইন কোরেরা , আনহেল ডি মারিয়া , পাওলো ডিবালা , লাউতেরো মার্টিনেজ , জিওভান্নি সিমিওনে , লিওনেল মেসি

উপসংহারঃ ১৯৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনা আর কখনও বিশ্বকাপ জেতে নি । যদিও সেই বিশ্বকাপ জয়ে আছে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ কলংক । আর ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে এখনও গর্ব করার মতো কিছু খুঁজে পায় না খোদ আর্জেন্টিনার ভক্তরা । সেই কারণেই তাদের প্রত্যাশা , মেসিরা অন্তত একটি বিশ্বকাপ জিতুক নিজেদের সামর্থ্যে । যেখানে থাকবে না কোন ‘কালিমা’ ।

তথ্য সূত্রঃ kriralok.net

Check Also

গ্রুপপর্বেই শেষ বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের দৌড়, ক্রোয়েশিয়ার উত্তরণ

রেফারির শেষ বাঁশি। আহমেদ বিন আলী স্টেডিয়ামে বসে পড়লেন লুকাকু-ডি ব্রুইনারা। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published.