মৃত্যুর দুই মাস পর হাসান বললেন ‘সৌদি আরব যাচ্ছি, দোয়া করো’

জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা অন্তর হাসানের (২৫) সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় ঢাকার যাত্রাবাড়ির শাহনাজ লিপির (৪১)। পরিচয়ের একপর্যায়ে অন্তরকে চাকরির প্রলোভন দেখান শাহনাজ। ভাগ্য বদলের আশায় চরকাউরিয়ার দক্ষিণ সীমারপাড় এলাকার বাড়ি ছেড়ে অন্তর ঢাকায় আসেন ২০২১ সালের ১৭ মে। অন্তরের গ্রামের বাড়িতে বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তান ছিল। ঢাকায় আসার দুইদিন পর একটি টিভি শোরুমে তার চাকরি হয়েছে বলে জানান পরিবারকে। শুনে পরিবার স্বস্তি পায়। কিছুদিন পর তিনি স্ত্রীকে জানান তার ফোন নষ্ট হয়েছে। ফোন ঠিক হলে কথা বলবেন।

এভাবে সপ্তাহখানেক পার হয়। তারপর অন্তরের ফোনে যোগাযোগ করলে এক নারী ফোন ধরতেন। সন্দেহ হওয়ায় ওই নারীর পরিচয় জানতে চান অন্তরের স্ত্রী লাইজু আক্তার। তখন ওই নারী বলেন, ‘আমি শাহনাজ লিপি, এই কোম্পানির মালিক। অন্তর কাজ করছে, তাই আমি ফোন রিসিভ করেছি।’

কিছুদিন পর অন্তরের বাবা ছেলেকে মধ্যরাতে ফোন করেন। সেদিনও ফোন ধরেন শাহনাজ। এতে অন্তরের পরিবারে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। আসলে তাদের ছেলে কোথায়? স্বামীর সন্ধান চেয়ে ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জামালপুরের বকশীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তারা। এরপর বকশীগঞ্জ থানা জানায় অন্তর মারা গেছে। তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় মাস পর ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনজনকে আসামি করে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করেন অন্তরের বাবা আক্তার হোসেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের নির্দেশ দেয়। মামলার প্রধান আসামি শাহনাজ লিপি। তার বাড়ি ফেনীর দাগনভূঁঞা উপজেলায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শাহনাজ দুইবার বিয়ে করেছেন। তার দ্বিতীয় স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্তরের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে প্রেম। তারা গেন্ডারিয়ার বিবির বাগিচা এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একসঙ্গে থাকতেন। স্থানীয়রা জানত অন্তর-শাহনাজ স্বামী-স্ত্রী। এমনকি শাহনাজ তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে অন্তরকে স্বামী বলে পরিচয় করিয়ে দিতেন।

২০২১ সালের ১ আগস্ট শাহনাজ মধ্যরাতে বাড়ির মালিককে জানান, তার স্বামী অসুস্থ। হাসপাতালে নিতে হবে। তারা দরজা খুলে দিলে অন্তরকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিডফোর্ড) নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানায় হাসপাতালে আনার আগেই অন্তর মারা গেছে। বিষয়টি অন্তরের পরিবারের কাছে গোপন রাখেন শাহনাজ। পরিবারকে না জানিয়েই স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ২ আগস্ট আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করেন। তখনও অন্তরের পরিবার জানত ছেলে বেঁচে আছে, চাকরি করছে।

এদিকে অন্তরের মৃত্যুর পরেও প্রায় এক মাস তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট (নাম: এস এম অন্তর হাসান) থেকে বাড়ির লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন শাহনাজ। অন্তরের স্ত্রী লাইজুর সঙ্গে কথা হত তার। তবে ভিডিও কল দিলে কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে কেটে দিতেন।

ওই বছরের ১৪ আগস্ট অন্তরের তার স্ত্রী লাইজুকে বলেন, ‘আমি সৌদি আরব যাচ্ছি। তোমরা আমার জন্য দোয়া করো। আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে তোমাকে নিয়ে আসব।’ অথচ অন্তরের ঠিকানা তখন আজিমপুর কবরস্তান।

বিদেশ যাওয়ার পরও লাইজুর সঙ্গে অন্তর পরিচয়ে কথা চালিয়ে যান শাহনাজ। এর মধ্যেই ২১ অক্টোবর অন্তর তার স্ত্রীকে জানান,‘আমি এখানে (সৌদি আরব) বিয়ে করেছি। তোমার সঙ্গে বেশি কথা হবে না। দেশে ফিরে বিস্তারিত বলব।’ এরপর লাইজুকে ব্লক করে দেওয়া হয়।

মূলত হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতেই প্রতারণার আশ্রয় নেন শাহনাজ। হত্যাকাণ্ডের দুই মাস পর তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। তারপর থেকে তিনি আত্মগোপনে। কোথায় থাকে জানে না তার পরিবারের কেউ। ধারণা করা হচ্ছে শাহনাজ বিদেশ চলে গেছেন।

অন্তরের স্ত্রী লাইজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাকরি প্রলোভন দেখিয়ে অন্তরকে ঢাকায় নিয়ে যান শাহনাজ। তারপর মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত হতে বলেন৷ রাজি না হওয়ায় অন্তরকে হত্যা করা হয়। এমনকি তার মৃত্যুর খবর পর্যন্ত আমাদের জানানো হয়নি। তিন মাস পর আমরা বিষয়টি জানতে পারি। এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমি শাহনাজের সর্বোচ্চ বিচার চাই।’

অন্তরের বাবা আক্তার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যা করে কবর দেওয়া হয়েছে, তবুও আমরা জানি না। আজিমপুর কবরস্থানে লাশের সন্ধানে গিয়েছি। সন্ধান পাইনি। সন্তানের লাশটিও আমরা পাচ্ছি না। সিআইডির তত্ত্বাবধানে মামলাটি আছে, আশা করি বিচার পাব।’

আজিমপুর কবরস্থানে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় থাকা মোহরার বলেন, ‘২০২১ সালের ২ আগস্ট শাহনাজ লিপি অন্তর হাসানের স্ত্রী পরিচয়ে লাশ নিয়ে আসেন। তিনি ৭৬/২/ই বিবির বাগিচা উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা পরিচয় দেন। লাশ দাফনের আগে তিনি হাসপাতালের ডেথ সাটিফিকেট দেখিয়েছেন।’

সেক্ষেত্রে অন্তরের পরিবার কেন সন্তানের কবর খুঁজে পাচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘এখানে দেড় বছর পর পর নতুন কবর দেওয়া হয়। দুই বছর হওয়ায় কবরের নম্বর নেই। ফলে কবরটি শনাক্ত করা যাচ্ছে না।’ মূলত এতে বিপাকে পড়েছে তার পরিবার। সন্তানের লাশটিও তারা সন্তাক্ত করতে পারছে না।

শাহনাজের ভাইয়ের স্ত্রী লিজা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লিপি বলতেন অন্তর তার তৃতীয় স্বামী। আমরা এভাবেই জানতাম। কিন্তু হঠাৎ শুনি তার স্বামী মারা গেছে। তারপর থেকে আমাদের যোগাযোগ হয়নি। এখন সে কোথায় আছে তাও জানি না।’

শাহনাজ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুনেছিলাম একবার মাদক মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত কি না তা আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে বাদী পক্ষের আইনজীবী কে এম মাহফুজ মিশু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। দীর্ঘদিন হলেও মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে না। ১৭৬-এর ২ ধারা অনুযায়ী কবর থেকে লাশ তুলে ময়নাতদন্ত করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করার নিয়ম। কিন্তু সেটি হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন (সিআইডি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিআর মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করার নিয়ম নেই। শাহনাজকে আমরা শনাক্ত করতে পারিনি। তার বাড়ির ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তবুও তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। দ্রত মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনো প্রমাণ মিলেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্তাধীন অবস্থায় এটা বলা যাচ্ছে না। তবে লিপি প্রতারণা করেছে এটা সত্য।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *