দুই মাইজভান্ডারীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের সভাপতি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে আওয়ামী লীগের শরিক জোট থেকে তিনবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। কিন্তু দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে চাচার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারেন তার ভাতিজা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী। চাচা নজিবুল বাশারের পাশাপাশি নতুন নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সভাপতি সাইফুদ্দীনও এবার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে চাচা-ভাতিজা দুজনের একজনকে এই আসন থেকে সমর্থন জানানো হতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন প্রয়াত সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের মেয়ে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি খাদিজাতুল আনোয়ার সানি। তিনি গতবারও মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু জোটের কারণে সরে দাঁড়ান। এবারও তাকে সরে দাঁড়াতে হতে পারে।

জানতে চাইলে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি খাদিজাতুল আনোয়ার বলেন, ‘দলের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই মেনে নেব। দেখা যাক কী হয়।’ তবে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খাদিজাতুল আনোয়ার সরে গেলেও লড়াইয়ে থাকতে পারেন ফটিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান হোসেন মো. আবু তৈয়ব। নির্বাচন করার জন্য তিনি গত বুধবার উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। উপজেলা চেয়ারম্যান পদেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারও তিনি নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন দল থেকে প্রার্থী দেয়ার জন্য। বাইরের কাউকে যাতে এই আসনটি ছাড়া না হয়। এ ক্ষেত্রে জোটের শরিক হিসেবে কাউকে দেয়া হলেও দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় বেকায়দায় পড়তে পারেন শরিকেরা।

জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন মুহুরী বলেন, ‘দল থেকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য দীর্ঘদিন থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা দাবি জানিয়ে আসছেন। এবার দল থেকে দেয়া হয়েছে। এটি ঠিক থাকলে সবাই খুশি হবে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নেবেন, শেষ পর্যন্ত সেটি মানতে হবে। আমরা মানব।’

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় উপজেলা ফটিকছড়ি। মাইজভান্ডার শরিফের কারণে দেশব্যাপী এই উপজেলার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তরীকত ফেডারেশন ও সুপ্রিম পার্টির প্রধান দুজনই সুফি ও সুন্নি মতাদর্শী তরিকার পরিচিত মুখ। সারা দেশের মতো ফটিকছড়িতেও দুই ভান্ডারীর ভক্ত-মুরিদ রয়েছে। চাচা-ভাতিজা একই আসনে মনোনয়ন জমা দেয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন সাধারণ ভোটারের পাশাপাশি ভক্ত-মুরিদেরা।

ফটিকছড়ির বাসিন্দা ও মাইজভান্ডারের ভক্তরা জানিয়েছেন, দরবারের ভক্ত হিসেবে এখান থেকে যিনিই প্রার্থী হন, তাকে তারা ভোট দেন। কিন্তু এবার দুজন হওয়ায় তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, সে অপেক্ষায় আছেন তারা।

আওয়ামী লীগের শরিক দল হিসেবে তরীকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ফটিকছড়িতে নির্বাচন করে আসছেন। নির্বাচন সামনে রেখে লিবারেল ইসলামিক জোট নামে ছয় দলের একটি জোটও গঠন করেছেন তিনি। নজিবুল বশর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে দলবদল করে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। একই বছরের ১২ জুনের নির্বাচনে নজিবুল পরাজিত হন। নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রয়াত রফিকুল আনোয়ার।

২০০১ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচন করে রফিকুলের কাছে আবার পরাজিত হন নজিবুল। এরপর বিএনপি ছেড়ে তিনি গঠন করেন তরীকত ফেডারেশন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক তরীকত ফেডারেশন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। সেই নির্বাচনে অবশ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন সাইফুদ্দিন আহমদ।

কিন্তু এবার আটঘাট বেঁধে নেমেছেন সুপ্রিম পার্টির সাইফুদ্দিন। রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পাওয়ার পর গত সেপ্টেম্বরে ফটিকছড়িতে বিশাল শোডাউন করেন তিনি। সরকারের সঙ্গে রয়েছে তার ভালো যোগাযোগ। শেষ গত ২৪ নভেম্বর ইসলামপন্থী ৯টি দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাইফুদ্দিন।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইসলামপন্থী দলগুলোর নেতারা নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। অনেকেই নিজেদের সংসদ সদস্য হওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সহায়তা চান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার পক্ষের ইসলামি শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভান্ডারী বলেন, ‘রাজনৈতিক সুষ্ঠু ধারা ফিরিয়ে আনা। অবহেলিত ফটিকছড়ির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, পর্যটনসহ সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন করার জন্য এবারও নির্বাচন করব। ফটিকছড়িবাসী চায় আমি নির্বাচন করি।’ চাচা নজিবুল বশরের মনোনয়ন নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করব। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট হয়নি।’

গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা যায়। এদিকে ভাতিজার প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে তরীকত ফেডারেশনের সভাপতি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেন, নির্বাচনে যে কেউ দাঁড়াতে পারেন। এটি তার অধিকার। অনেকেই অনেক কিছু বলছেন, অনেকে ষড়যন্ত্র করছেন। সেদিকে নজর দেয়ার সুযোগ নেই। ফটিকছড়ির উন্নয়নে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার কাজ হয়েছে। তাই জনগণ এবারও তাকে বেছে নেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *