Home / খেলার খবর / বিশ্রামটা সাকিব-তামিমের নয়, মোস্তাফিজদেরই প্রাপ্য

বিশ্রামটা সাকিব-তামিমের নয়, মোস্তাফিজদেরই প্রাপ্য

বোঝা যায়, খালেদ মাহমুদ সুজন কথাগুলো আক্ষেপ থেকেই বলেছেন। সত্যিটাও বলেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দাপিয়ে বেড়াতে পারেন, এমন খুব বেশি পেসার বাংলাদেশে নেই।

দক্ষিণ আফ্রিকায় তাসকিন আহমেদ-শরিফুল ইসলামরা পড়েছেন চোটে, শ্রীলঙ্কা সিরিজে দুজনের কাউকেই পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। মোস্তাফিজুর রহমানকে এ সময়টায় ফাঁকা পাওয়া গেলে ভালো তো হতোই।

বক্তব্যের এ পর্যন্ত কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু ৭ মে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে খালেদ মাহমুদ এরপর যা বলেছেন, সেখানে বিতর্কের উপাদান তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেই, জাগছে মোস্তাফিজের টেস্ট খেলা না-খেলা ছাপিয়ে আরও গুরুতর কিছু প্রশ্ন। এক এক করে আসা যাক।

‘মোস্তাফিজের (টেস্ট খেলব না) বলা শোভা পায় না’ টেস্ট খেলতে চান না, বোর্ডের সঙ্গে এ রকম একটা সমঝোতা হয়েই গেছে মোস্তাফিজের। নিজেকে রাখেননি লাল বলের কেন্দ্রীয় চুক্তিতেও।

বিসিবিও তখন মেনে নিয়েছিল তাঁর সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি সে রকম নেই, সেটা হাবভাবেই পরিষ্কার। বিসিবি সভাপতি সরাসরিই বলেছেন, মোস্তাফিজকে টেস্ট খেলতে দেখতে চান।

কিন্তু খালেদ মাহমুদ যেই যুক্তিটা দাঁড় করালেন এর পেছনে, সেটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। বললেন, ‘আমার মনে হয় না, খেলোয়াড়রা বলবে এই ফরম্যাট খেলব, এই ফরম্যাট খেলব না। তামিম-সাকিব হলে বিষয়টা শোভা পায়। মোস্তাফিজের এটা বলা শোভা পায় না।’

তামিম-সাকিব অনেক বছর ধরে খেলছেন, এই যুক্তিতেই নাকি তাঁরা বিশ্রাম চাইতে পারেন। অথচ ২০১৫ সালের এক গবেষণা বলছে, ক্রিকেটারদের যত ধরন আছে, তার মধ্যে বোলারদের চোটে পড়ার আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে ফাস্ট বোলারদের। আর এই চোটের মূল কারণ? অতিরিক্ত ওয়ার্কলোড!

এমনিতেই চোটের সঙ্গে মোস্তাফিজের সখ্য ক্যারিয়ারের গোড়া থেকে। অভিষেকের পর বছর না পেরোতেই পড়েছিলেন সাইড স্ট্রেইন ইনজুরিতে, যে কারণে মিস করেছেন এশিয়া কাপের কয়েকটা ম্যাচও। মাস ছয়েক পরে জানা গেল, মোস্তাফিজের সমস্যা আরও গুরুতর।

যে অ্যাকশনে বল করছেন, সেখানে অ্যালাইনমেন্টের খুব বড় গলদ বলে কাঁধের ওপর চাপ পড়ে খুব বেশি, এক বছর ধরে অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে কাঁধের সুপিরিয়র ল্যাব্রাম পেশিতে চিড় ধরল। দৌড়াতে হলো শল্যবিদের ছুরি-কাঁচির নিচে। মাঠের বাইরে গেলেন ছয় মাসের জন্য।

প্রত্যাবর্তনের পর পারফরম্যান্সে নজর দেবেন কী, তাঁকে মন দিতে হলো অ্যাকশন শুধরানোয়। হারিয়ে ফেললেন শুরুর ম্যাজিক। সমালোচনার তীব্র বাণ ছুটল চতুর্দিক থেকে। শুনতে হলো, ‘মোস্তাফিজ হারিয়ে গেছেন।’

কিন্তু মোস্তাফিজ যে পুরোপুরি হারালেন না, বরং এখনো তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স, তার জন্য বিসিবির কোচদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। ফ্রন্টফুট কন্ট্যাক্টে অ্যালাইনমেন্ট ঠিক তো হয়েছেই,

ডানহাতিদের জন্য বল ভেতরে ঢোকাচ্ছেন, লেগ কাটারও শিখেছেন। তবে বায়োমেকানিকদের কাছে তাঁর অ্যাকশনটা নিয়ে গেলে এখনো বলা হবে, ‘ভালো, তবে আরও ভালো হতে পারে।’ বুঝেশুনে ব্যবহার না করলে পরিবর্তিত অ্যাকশনেও লাভ হবে না, ফিরে আসবে ইনজুরির ভূত।

মোস্তাফিজের মনে হচ্ছে, টেস্ট না খেললেই ইনজুরির সঙ্গে বজায় রাখা যাবে নিরাপদ দূরত্ব। সীমিত ওভারের ক্রিকেটেই যেহেতু তাঁর সাফল্য বেশি, তাই ওই সংস্করণেই নিজেকে তরতাজা রাখতে চান। কিন্তু খালেদ মাহমুদের কাছে ধোপে টিকছে না সেটা। তাঁর চোখে টেস্টে আর টি-টোয়েন্টিতে ওয়ার্কলোড একই!

‘ওয়ার্কলোড কোথায় বেশি আসে?’ ওয়ার্কলোডের প্রশ্ন তোলায় খালেদ মাহমুদ ব্যাট চালিয়েছিলেন সপাটে, ‘(মোস্তাফিজ) আইপিএলে কয়টা ম্যাচ খেলে? ছয়টাই ধরলাম। খালেদ, এবাদত, তাসকিন, শরিফুল দুই টেস্টের চার ইনিংসে হয়তো ৬০ ওভার করে বল করে। ওয়ার্কলোড তো একই হচ্ছে!’

‘হয়তো’ শব্দটা উঠিয়ে এবার একটু নিরেট পরিসংখ্যানে নজর দেওয়া যাক। সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের হিসাবপত্র বের করে দেখা যাচ্ছে, দুই টেস্টেই খেলা এবাদত হোসেন আর খালেদ হোসেন বল করেছেন ৭৬ ওভার করে,

প্রথম টেস্টে খেলা তাসকিন আহমেদ হাত ঘুরিয়েছিলেন ৩৪ ওভার। ১২ দিনের ব্যবধানে শেষ হয়েছিল দুই টেস্ট। যদি অনুশীলন সেশনগুলো বাদও দেওয়া হয়, তবু প্রতি সপ্তাহে এবাদত আর খালেদ হাত ঘুরিয়েছেন গড়ে ৪৪ ওভার করে।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কোচিং গাইডলাইন মানলে প্রতি স্পেলে ৮ ওভার এবং দিনে ২০ ওভারের বেশি বল দেওয়া উচিত নয় পেসারদের। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সপ্তাহে ১৭০ বলের বেশি করলে ইনজুরিতে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুলাংশে।

এবার আসা যাক মোস্তাফিজের কথায়। আইপিএলের জন্য ভারতের মাটিতে পা রেখেছেন সাত সপ্তাহ হতে চলল। এ সময়ে ৮ ম্যাচে ৩২ ওভার বল করতে হয়েছে তাঁকে। অর্থাৎ সপ্তাহে ছয় ওভারের বেশি নয়। ওয়ার্কলোড সমান দূরে থাক, সংখ্যাটা এবাদত-খালেদের চেয়ে প্রায় সাত গুণ কম।‘ওয়ার্কলোড কোথায় বেশি আসে?’ প্রশ্নের উত্তরটা তাই অবধারিতভাবেই, টেস্ট ক্রিকেটে।

‘আমাদের পেসাররা ইনজুরিপ্রবণ’ ‘আমাদের ছেলেরা স্টার্ক-হ্যাজলউডের মতো না। এরা ইনজুরিপ্রবণ। সুতরাং, আমরা চাই সবাই বিরতি নিয়ে নিয়ে খেলুক। তাহলে লম্বা সময় ধরে ওদের সার্ভিস পাব’—খালেদ মাহমুদের উপলব্ধি।

বাংলাদেশ দলের সঙ্গে সঙ্গে গত জানুয়ারি থেকে সময়টা ভীষণ ব্যস্ত কেটেছে তাসকিন আহমেদের। এই পাঁচ মাসে কেবল ম্যাচেই বল করেছেন ১৮১.৫ ওভার। নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার যে মন্ত্র জপেছেন,

সেটা কড়ায়-গন্ডায় মেনে পারফর্মও করছেন। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়, দক্ষিণ আফ্রিকার বুকে ওয়ানডে সিরিজ জয়ে তাঁর অবদান মনে রাখতেই হবে।

কিন্তু এই সর্বস্ব নিংড়ে দিতে গিয়ে যা হচ্ছে, চোটে পড়ছেন। বিপিএলে পড়লেন পিঠের চোটে, এবার শ্রীলঙ্কা সিরিজে খেলতে পারছেন না কাঁধের সমস্যায়। অথচ, এই পাঁচ মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর চেয়ে বেশি ডেলিভারি করেছেন সাতজন পেসার,

কিন্তু তাঁরা দিব্যি চলছেন-ফিরছেন। এ থেকে একটা বিষয় বেশ বোঝা যায়, অত পরিমাণ চাপ নেওয়ার মতো শরীর এখনো তাসকিনের হয়নি। তাসকিনের বোলিং অ্যাকশনটাকে আরও মসৃণ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।

কিন্তু সেটা কেন হচ্ছে না? বাংলাদেশি পেসাররা এখনো স্টার্ক-হ্যাজলউডের মানদণ্ডে পৌঁছাননি, সেটা তো সরল স্বীকারোক্তিই। কিন্তু ইনজুরি ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে তাঁরা কেন অস্ট্রেলিয়ার কাতারে যেতে পারবেন না? ফাস্ট বোলারদের সুস্থ রাখাটা তো কোনো মহাকাশবিজ্ঞান নয়!

প্যাট কামিন্সের উদাহরণটাই বিবেচনায় নেওয়া যাক। যে ‘মিক্সড’ অ্যাকশনে বল করলে পেসারদের চোটে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি, ক্যারিয়ারের শুরুতে সেই অ্যাকশনেই বল করতেন তিনি।

কোমর একদিকে আর কাঁধ অন্যদিকে থাকত বলে পিঠের নিম্নাংশে দেখা গিয়েছিল স্ট্রেস ফ্র্যাকচার। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তাঁর এই সমস্যা চিহ্নিত করেছিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুতেই। প্রথম টেস্টেই তিন উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ জেতালেও পরবর্তী টেস্ট খেলার আগে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ছয় বছর।

মাঝের সময়টায় কামিন্স অ্যাকশন শুধরেছেন। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া কেবল তাঁর জন্যই ভাড়া করেছিল গ্র্যাভিটি ডিফাইয়িং ট্রেড মিল। মাঝে ওয়ানডে খেলানো হয়েছে তাঁকে, ছাড়পত্র দিয়েছে আইপিএল-বিগ ব্যাশ খেলতেও, কিন্তু টেস্ট আঙিনায় নামানোর কোনো ঝুঁকি নেয়নি তখন।

সেই সহিষ্ণুতা আর বিনিয়োগের ফল মিলতে শুরু করেছে এখন। টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর বোলার এখন কামিন্স, এ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বল ছোড়া পেসার তিনি। অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলের নেতৃত্বের ব্যাটনটাও তাঁরই হাতে।

ফাস্ট বোলারদের ঘিরে যথাযথ পরিকল্পনা, টেকনিক আর বিনিয়োগের ফলাফল অবশ্য এমনটাই হওয়ার কথা। তাই শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, ফাস্ট বোলারদের সুরক্ষাকল্পে সব দেশেই এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এখন।

যশপ্রীত বুমরাকে টেস্ট খেলানোর আগে ভারত তাই সময় নিয়েছে দুই বছর, ইংল্যান্ড বছরে প্রায় দেড় ডজন টেস্ট খেললেও ফাস্ট বোলারদের টানা তিন টেস্টে মাঠে নামানোর আগে দুবার ভাবে নিশ্চিত করেই।

মোস্তাফিজকে খালেদ মাহমুদ তিন টেস্টে চাইছেন না। এমনও বলেছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটা টেস্টে মাঠে নামলেই তিনি খুশি। ফাস্ট বোলারদের আকালের সময়টায় মোস্তাফিজই হয়তোবা হতে পারেন আলোকবর্তিকা।

হয়তো এতক্ষণ যে অজানা আশঙ্কায় হাজারখানেক শব্দ খরচা করা হলো, তার কিছুই হবে না। মোস্তাফিজ ভালো খেলবেন, সুস্থও থাকবেন। তবু ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায় তো, ফাস্ট বোলারদের নিয়ে ভাবতে হচ্ছে এ কারণেই।

২০০১ সাল। ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টের আগের দিনও মাশরাফি বিন মুর্তজার দুই কুঁচকিতে চোট, টান লেগেছে পিঠের বাঁ পাশের পেশিতে।

এমন পরিস্থিতিতে পেসারদের না খেলানোই কর্তব্য। কিন্তু বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে খেলাল, প্রথম ইনিংসে ১৬ ওভার বলও করাল। বাকি জীবন ধরে এই সিদ্ধান্তের খেসারত মাশরাফিকে দিয়ে যেতে হলো।

মিরপুরের বাতাসে কান পাতলে তাই ঘোর অমাবস্যার মধ্যরাতেও এখনো গুঞ্জন শোনা যায়—ওয়েলিংটনে সেদিন না খেলালেই মাশরাফির গল্পটা আক্ষেপের বদলে বিমলানন্দের হতো।

Check Also

দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটাও তেমন ভালো হয়নি বাংলাদেশ দলের

অ্যান্টিগা টেস্টে প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটাও তেমন ভালো হয়নি বাংলাদেশ দলের। তবে প্রথম …

Leave a Reply

Your email address will not be published.